ঢাকা, ২৬ জুন বুধবার, ২০১৯ || ১৩ আষাঢ় ১৪২৬
LifeTv24 :: লাইফ টিভি 24
১৪৬

ছাঁটাই এবং মামলায় দিশেহারা শ্রমিকেরা

প্রকাশিত: ১৭:৩৬ ১৮ জানুয়ারি ২০১৯  

ছবি সংগৃহীত

ছবি সংগৃহীত


গার্মেন্টস শ্রমিকদের টানা ৮ দিনের আন্দোলনের পরে সরকার এবং মালিকপক্ষ মিলে সমন্বয় করেছেন মজুরিকাঠামো।ঢাকার উত্তরা থেকে শুরু হএয়া এ আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্নশিল্পাঞ্চলে। সাভার,আশুলিয়াতে হয়নি তার ব্যাতিক্রম।

ন্যায্য দাবীতে আন্দোলন করেও এখন বিপাকে পড়ছে গার্মেন্টস শ্রমিকরা। বিক্ষোভের ঘটনায় আশুলিয়া এলাকার অন্তত ছয় কারখানায় ছাঁটাই করা হয়েছে তিন শতাধিক কর্মী। শ্রমিক সংগঠনের হিসাবে এ সংখ্যা ৮ শতাধিক। কারখানা ফটকে চাকরিচ্যুত কর্মীদের ছবিসহ তালিকা টানিয়ে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি আন্দোলনের সময় ক্ষতিসাধনের অভিযোগে সাভার ও আশুলিয়া থানায় বিভিন্ন কারখানার পক্ষ থেকে অন্তত ১০টি মামলা হয়েছে। মামলাগুলোয় আসামি করা হয়েছে এক হাজারের বেশি শ্রমিককে। এরই মধ্যে গ্রেফতার হয়েছে ৪৪ জন।

 

শ্রমিক সংগঠনগুলোর নেতারা বলছেন, মামলায় নাম উল্লেখ করা হয়—এমন শ্রমিকদের প্রায় সবাই চাকরিচ্যুত হয়েছেন। আসামিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নারী শ্রমিক রয়েছেন। ছাঁটাই ও মামলার প্রতিবাদে তাঁরা কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামবেন বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতির সভাপ্রধান তাসলিমা আক্তার।

বিভিন্ন সুত্র থেকে যানাযায়, টানা আট দিনের শ্রমিক অসন্তোষের পর গত মঙ্গলবার থেকে তৈরি পোশাক শ্রমিকরা কাজে ফিরলেও বিভিন্ন কারখানায় ঝুলছে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের নোটিস। স্থানীয়রা জানান, আশুলিয়ার বুড়ির বাজার, জিরাবো ও কাঠগড়াসহ বিভিন্ন এলাকার এআর জিন্স প্রডিউসার লি., এফজিএস ডেনিম ওয়্যার লি. ও লিলি ফ্যাশনসহ কয়েকটি কারখানায় শ্রমিকদের ছবি সংবলিত ছাঁটাইয়ের তালিকা কারখানার মূল ফটকে ঝুলতে দেখা গেছে। এসব তালিকায় তিন শতাধিক শ্রমিকের নাম থাকলেও শ্রমিক সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী বুধবার পর্যন্ত প্রায় আট শতাধিক শ্রমিক ছাঁটাই করা হয়েছে। এ সময় প্রায় ১০টি কারখানায় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণার নোটিস ঝুলতে দেখা গেছে।

টেক্সটাইল গার্মেন্ট ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান বলেন, আন্দোলন ছাড়া কোনো দাবি আদায় হয় না। তাই শ্রমিকরা তাদের দাবি আদায়ের জন্য আন্দোলন করে থাকেন। শ্রমিক অসন্তোষের ঘটনায় যারা নাশকতাকারী এবং ভাঙচুরের সঙ্গে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। কিন্তু কোনো নিরপরাধ শ্রমিক যেন ছাঁটাইয়ের শিকার না হয়, সে বিষয়েও কর্তৃপক্ষকে খেয়াল রাখা উচিত।

 

জানা গেছে, কারখানায় ভাঙচুরসহ মারপিট করে ক্ষতিসাধন, চুরি ও ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগে ১০ জানুয়ারি ৫৫ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা ৩০০ শ্রমিকের বিরুদ্ধে আশুলিয়া থানায় একটি মামলা করেন মেট্রো নিটিং অ্যান্ড ডায়িং মিলস লিমিটেডের নিরাপত্তা কর্মকর্তা আবদুস সালাম। ১১ জানুয়ারি এআর জিন্স প্রডিউসার লিমিটেডের প্রশাসনিক কর্মকর্তা শাহ আজিজ বাদী হয়ে ৬২ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আড়াইশজনের বিরুদ্ধে একটি মামলা করেন। এদিন একই অভিযোগে নিট এশিয়া লিমিটেড কারখানার প্রধান ব্যবস্থাপক (অর্থ ও হিসাব) আনোয়ারুল ইসলাম বাদী হয়ে ৫০ জনের নাম উল্লেখ করে আশুলিয়া থানায় একটি মামলা করেন। ১২ জানুয়ারি অরবিট অ্যাপারেলস লিমিটেডের শফিকুল ইসলাম বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ৫০ জনের বিরুদ্ধে একটি মামলা করেন। একই দিন মাহমুদ ফ্যাশন লিমিটেড কারখানার এইচআর বিভাগের সিনিয়র এক্সিকিউটিভ শাহ আলম বাদী হয়ে ২৯ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও ২৫ জনের বিরুদ্ধে একটি মামলা করেন। এছাড়া ১৩ জানুয়ারি হা-মীম গ্রুপের নিরাপত্তাকর্মী জাহাঙ্গীর আলম বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ৬০ জনের বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা করেন।
এছাড়া সাভার মডেল থানায় দায়ের করা দুটি মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, তৈরি পোশাক কারখানার ভেতরে ভাঙচুর, লুটপাট, মারধর ও নাশকতা সৃষ্টির অভিযোগে ১৩ জানুয়ারি ২৪ শ্রমিকের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা ১৬৫ জনের বিরুদ্ধে একটি মামলা (নং-৫০) করেছেন জেকে গ্রুপের ব্যবস্থাপক (প্রশাসন) তারিক হাসান। একই অভিযোগে সাভারের হরিণধরা এলাকার ডার্ড গ্রুপের দীপ্ত অ্যাপারেলসের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. মোস্তফা একটি মামলা (৬৯) দায়ের করেছেন।

 

তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মো. সিদ্দিকুর রহমানের কাছে শ্রমিক হয়রানির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন , ‘গত মঙ্গলবার সচিবালয়ে সরকার, মালিক ও শ্রমিকদের ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে, কোনো নিরীহ শ্রমিককে হয়রানি করা যাবে না। শুধু সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতেই বিশৃঙ্খলায় জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় নেওয়া যাবে। সেই নির্দেশনা মেনেই কয়েকটি কারখানা মামলা করেছে। কোনো নিরীহ শ্রমিককে হয়রানি করা হচ্ছে না। শ্রমিক ছাঁটাইয়ের বিষয়ে কোনো শ্রমিক কিংবা শ্রমিকনেতা আমাদের কাছে অভিযোগ করেনি। বিষয়টি আমার জানা নেই।’

বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল শ্রমিক ফেডারেশনের সাভার-আশুলিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক কমিটির সভাপতি সংবাদ মাধ্যমে বলেন, চাকরিচ্যুত হয়ে তাঁদের কাছে বিপুল শ্রমিক আসছেন। এফএনএফ অ্যাপারেলস, আল গাউসিয়া গার্মেন্টস, নিট এশিয়া, ডনলিয়ন ১ ও ২, হলিউড গার্মেন্টস, এফজিএস ডেনিম, কেআরএফ গার্মেন্টস থেকে চাকরিচ্যুত শ্রমিকেরা যোগাযোগ করছেন। তাঁরা মামলারও ভয় পাচ্ছেন। আরেকটা ভয় হচ্ছে, চাকরিচ্যুত শ্রমিকদের নাম ‘অনলাইনে’ দিয়ে দেওয়া। অর্থাৎ তাঁদের নামগুলো পোশাকমালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর একটা বিশেষ সার্ভারে কালো তালিকাভুক্ত হয়ে থাকে। এরপর ওই সব শ্রমিককে আর কোনো কারখানাই কাজে নেবে না।

বিপ্লবী গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল শ্রমিক ফোরামের আহ্বায়ক শহীদুল ইসলাম বলেন, সাভারের উলাইল এলাকার কয়েকটি কারখানায় তাঁদের বেশ কিছু সদস্য মামলার আসামি হয়েছেন, চাকরিও হারিয়েছেন। ওই সব শ্রমিকের জন্য সংগঠনের নেতারা এখন আদালতে দৌড়াচ্ছেন। তিনি আরও বলেন, চাকরিচ্যুত শ্রমিকেরা অন্য কারখানায় কাজ খোঁজা শুরু করেছেন। তবে অতীতে দেখা গেছে, এভাবে চাকরিচ্যুত শ্রমিকদের একটা অংশকে পেশা বদলাতে হয়েছে।

সম্মিলিত গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি নাজমা আক্তার বলেন, ‘নিরীহ শ্রমিকেরা যেন ছাঁটাই এবং হয়রানির শিকার না হন, বিষয়টি গত মঙ্গলবারের বৈঠকে আমরা বারবার বলেছি। নিরীহ শ্রমিকদের ছাঁটাই ও গ্রেপ্তার করা হলে সাধারণ শ্রমিকদের মধ্যে কষ্ট থেকে যাবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘মামলা, ছাঁটাই ও পুলিশের ভয় দেখিয়ে শ্রমিকদের হয়তো সাময়িকভাবে দমানো যায়। তবে ভবিষ্যতের জন্য এসব ভালো না। তা ছাড়া এককভাবে শ্রমিকদের দোষ দিয়ে লাভ হবে না। সরকারের কাছে অনুরোধ, মালিকদের কোথায় গাফিলতি আছে, সেটিও খুঁজে বের করা দরকার। কারণ পোশাকশিল্প বড় হলেও খাতটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা পরিপক্ব হয়ে ওঠেননি।’

ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার শাহ মিজান শাফিউর রহমান জানান, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক একটি মহল শ্রমিক আন্দোলনের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে গার্মেন্টশিল্পকে ধ্বংসের চেষ্টা করছে। তারা এসব আন্দোলনে ইন্ধন দিয়ে এটিকে আরও বড় ও ধ্বংসাত্মক পর্যায়ে নিয়ে যেতে চায়। এরই মধ্যে তাদের শনাক্ত করেছি এবং অনেককে গ্রেফতারও করা হয়েছে।
তবে সাধারণ ও নিরীহ শ্রমিকরা কোনো হয়রানির শিকার হবেন না বলে নিশ্চিত করে পুলিশ সুপার বলেন, দোষী ও অপরাধীদেরই শুধু আইনের আওতায় আনা হবে।

 

এসময় তিনি সাধারণ শ্রমিকদের ভীতির কোনো কারণ নেই জানিয়ে যারা কাজ করতে চান, তাদের শান্তিপূর্ণভাবে কাজে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান।

 


এই বিভাগের আরো খবর