ঢাকা, ৩০ জানুয়ারি শুক্রবার, ২০২৬ || ১৭ মাঘ ১৪৩২
good-food
১০

বিএনপি-জামায়াত-এনসিপি: আওয়ামী লীগের ভোট যাবে কার বাক্সে?

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ১৭:৫৮ ৩০ জানুয়ারি ২০২৬  

বাংলাদেশের নির্বাচনের চিরচেনা দৃশ্য হলো নৌকা আর ধানের শীষের লড়াই। কিন্তু ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির ক্যালেন্ডার বলছে, এবার দৃশ্যপট ভিন্ন। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী এই বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা, আর আইনত নির্বাচনের বাইরে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, দেশের একটি অংশের মানুষের যে ভোট ঐতিহ্যগতভাবে ‘নৌকা’ প্রতীকে পড়ত, সেই ভোটাররা এবার কী করবেন? তাদের মনস্তত্ত্ব, ধর্মীয় সংবেদনশীলতা এবং তৃণমূলের বর্তমান অবস্থান বিশ্লেষণ করলে এক জটিল সমীকরণ বেরিয়ে আসে।

আদর্শিক শূন্যতা ও তৃণমূলের নীরবতা

আওয়ামী লীগের রাজনীতির মূল ভিত্তি ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদ এবং অসাম্প্রদায়িকতার বয়ান। 

বিগত ১৬ বছর অবশ্য দেখা গিয়েছে এক ভিন্ন দৃশ্য। তবুও দলটির তৃণমূলের বড় একটি অংশ বংশপরম্পরায় এই আদর্শকে ধারণ করে। বর্তমান পরিস্থিতিতে দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে কোনো দিকনির্দেশনা না থাকায় এই বিশাল কর্মী ও সমর্থক গোষ্ঠী চরম দিশেহারা। তারা কি ভোটকেন্দ্রে যাবেন? নাকি ঘরে বসে নীরব প্রতিবাদ জানাবেন?

ঐতিহ্যগতভাবে বাংলাদেশের মানুষ ‘হারতে জানা’ দলের সঙ্গে থাকতে চায় না। কিন্তু আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন। দলটির সমর্থকরা এখন কেবল রাজনৈতিক কর্মী নন, অনেকেই সামাজিক ও আইনি চাপের মুখে ‘অস্তিত্ব রক্ষার’ লড়াই করছেন। তৃণমূলের অনেক সমর্থক এখন স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাবশালী নতুন শক্তির (বিশেষ করে বিএনপি বা জামায়াত) সাথে এক ধরনের ‘অলিখিত সমঝোতা’ করে টিকে থাকার চেষ্টা করছেন। এই সমঝোতার প্রতিফলন ব্যালট বাক্সে দেখা যেতে পারে।

ধর্মের কার্ড ও ভোটের মেরুকরণ

বাংলাদেশের ভোটের রাজনীতিতে ধর্ম সবসময়ই একটি শক্তিশালী অনুঘটক। আওয়ামী লীগের সমর্থকগোষ্ঠীর মধ্যে ধর্মীয় সংখ্যালঘু, বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি বড় অংশ ছিল। বর্তমান প্রেক্ষাপটে নিরাপত্তাহীনতা এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে এই ভোটারদের মধ্যে এক ধরনের ‘ভীতি’ কাজ করছে। তারা এমন কাউকে খুঁজছেন যারা তাদের জানমালের নিরাপত্তা দিতে পারবে।

মজার বিষয় হলো, সাম্প্রতিক কিছু সমীক্ষা ও প্রবণতা বলছে, আওয়ামী লীগের অনেক সাধারণ মুসলিম ভোটার এখন জামায়াতে ইসলামীর তথাকথিত ‘সুশৃঙ্খল’ ইমেজের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছেন। তবে এটি এখনি নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। যারা দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান চান, তারা আদর্শিক পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও জামায়াতকে একটি বিকল্প ভাবছেন, কেননা জামায়াতের সাম্প্রতিক বক্তব্যগুলোতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান দেখা যায়। অন্যদিকে, কট্টর ধর্মনিরপেক্ষ ভোটাররা পড়ছেন মহাসংকটে। তাদের জন্য নির্বাচনে কোনো স্পষ্ট ‘লিবারেল’ বিকল্প নেই।

তবে এদিক থেকে বিএনপি বেশ একটু সুবিধাজনক অবস্থানে আছেন। মহাসচিবের বক্তব্য "আওয়ামী লীগের নিরপরাধ নেতাকর্মীদের বুকে টেনে নেব" অনেককেই আকৃষ্ট করবে বলে ধারনা করা যায়। 

ভোট কি ভাগ হবে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে?

আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাংক দখলের লড়াইয়ে এখন প্রধান দুই প্রতিপক্ষ হলো বিএনপি এবং জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট। বিএনপির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মিত্ররা মনে করছেন, আওয়ামী লীগ বিরোধীরা স্বাভাবিকভাবেই ধানের শীষে ভোট দেবেন। কিন্তু জামায়াত এবার অত্যন্ত কৌশলী। তারা তৃণমূল পর্যায়ে সেবামূলক কাজ এবং সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আওয়ামী লীগের একটি অংশকে নিজেদের দিকে টানার চেষ্টা করছে।

আবার অনেক আসনে আওয়ামী লীগের স্থানীয় প্রভাবশালী নেতারা নিজেদের ‘পিঠ বাঁচাতে’ নেপথ্যে থেকে কোনো নির্দিষ্ট প্রার্থীকে সমর্থন দিচ্ছেন। একে আমরা বলতে পারি ‘প্রক্সি পলিটিক্স’। অর্থাৎ, প্রার্থী আওয়ামী লীগের নয়, কিন্তু ভোট ব্যাংকটি তাদেরই।

জনগণের চিরাচরিত মনস্তত্ত্ব

বাঙালিরা উৎসবপ্রিয়। নির্বাচন এখানে একটি উৎসব। কিন্তু এবারের উৎসবের রং অনেকটা ধূসর। সাধারণ মানুষের মনে এক ধরনের ‘ক্লান্তি’ কাজ করছে। তারা স্থিতিশীলতা চায়। যারা মনে করেন আওয়ামী লীগ আমলে সুশাসন ছিল না, তারা হয়তো পরিবর্তনের আশায় ভোট দেবেন। কিন্তু যারা অন্ধ সমর্থক, তাদের একটি বড় অংশ ভোটকেন্দ্রে না যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। এতে করে সামগ্রিক ভোটার উপস্থিতিতে প্রভাব পড়তে পারে।

এর বাইরেও, যেহেতু উৎসবের কথা সামনেই এলো, তাই আলোচনা করা- আওয়ামীল লীগের একটি বড় অংশ ধর্মীও অনুভূতির চেয়ে সেকুলার ধারায় স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। কোন গবেষণালব্ধ ফল থেকে এটি প্রমাণ না করা গেলেও, সাধারণ মানুষের আলোচনায় এই বিষয়টি চোখে পর্বে। এই অংশের ভোট বিএনপির ব্যালটে যাবার সম্ভাবনাই বেশি।

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের উত্তরাধিকার বহন করলেও তারা আওয়ামী ভোটারদের বড় কোনো অংশকে এখনো আস্থায় নিতে পারেনি। দলটির হাতে গোনা কয়েকজন প্রার্থী যাদের ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি উজ্জ্বল এবং যারা স্থানীয়ভাবে সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন, তারা আওয়ামী লীগের হতাশ ভোটারদের সামান্য সাড়া পাচ্ছেন। তবে একটি পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক দল হিসেবে এনসিপি এখনো আওয়ামী লীগের বিশাল শূন্যতা পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে, কারণ দলটির রাজনৈতিক ভিত্তি এবং অভিজ্ঞতার অভাব সাধারণ ভোটারদের মধ্যে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।

১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন কেবল ক্ষমতা বদলের নয়, এটি রাজনৈতিক পরিচয়ের এক বিরাট বিবর্তনের সাক্ষী হতে যাচ্ছে। আওয়ামী লীগের ভোটগুলো কোনো একটি নির্দিষ্ট বাক্সে যাবে না; বরং এটি আদর্শ, নিরাপত্তা এবং স্থানীয় সমীকরণের ভিত্তিতে তিন-চার ভাগে বিভক্ত হয়ে যাবে। ভোটাররা হয়তো তাদের পুরোনো ভালোবাসাকে বিসর্জন দিয়ে ‘ক্ষতি কমানোর’ (Lesser evil) নীতিতে ভোট দেবেন।

শেষ পর্যন্ত ব্যালট বাক্সই বলে দেবে, কোন দল অন্য দলের জয়-পরাজয়ে কতটা ভূমিকা রাখতে পারে।

ভোটের সব খবর বিভাগের পাঠকপ্রিয় খবর