ঢাকা, ২১ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার, ২০২১ || ৬ আশ্বিন ১৪২৮
good-food
১৭৯

আলোচিত-সমালোচিত হেলেনা জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ১৪:০০ ৩০ জুলাই ২০২১  

নানা কর্মকাণ্ডে আলোচিত-সমালোচিত, আওয়ামী লীগে পদ খোয়ানো ব্যবসায়ী নেতা হেলেনা জাহাঙ্গীর। তার সাম্প্রতিক কিছু কর্মকান্ড দেশজুড়ে ছিলো সবার মুখে মুখে। এমনই প্রেক্ষাপটে বৃহস্পতিবার রাতে অভিযান চালানো হয় তার বাসভবনে। মধ্যরাতে  তাকে আটকের পর গ্রেফতার দেখানো  হয়। 

 
আওয়ামী চাকরিজীবী লীগ নামে নতুন সংগঠন করে সম্প্রতি আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেয়া হেলেনা জাহাঙ্গীরে ঢাকার গুলশানের বাড়িতে র‌্যাব অভিযান শুরু করে বৃহস্পতিবার রাত ৮টার দিকে।

 

পরে রাত সোয়া ১২ টায় বাড়ি থেকে নিয়ে যাওয়ার সময় র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল কে এম আজাদ বলেন, তাকে আটক করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

 

কী কারণে - জানতে চাইলে র‌্যাব কর্মকর্তা বলেন, তার বাসায় মদ, হরিণের চামড়া, ক্যাসিনো বোর্ড, ওয়াকিটকিসহ বেশ কিছু অবৈধ সরঞ্জাম পাওয়া গেছে।

 

রাত সোয়া ১২টার দিকে পাঁচ তলা ওই বাড়িতে নিজের ফ্ল্যাট থেকে হেলেনা জাহাঙ্গীর যখন র্যাব সদস্যদের সঙ্গে বেরিয়ে আসেন, তার মুখে ছিল মাস্ক। পরনে ছিল বেগুনি রঙের জামা ও হলুদ ওড়না।

 

তিনি উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীদের উদ্দেশে দুবার হাত নাড়েন। মাস্ক নামিয়ে সবার উদ্দেশে হাসি দেন। এসময় তিনি কিছু বলতে চাইলেও সেই সুযোগ পাননি। র্যাব সদস্যরা তাকে একটি মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যায়।

 

এসময় একটি ট্রেতে করে কিছু ছুরি, মদ, বিদেশি মুদ্রা এবং লাল একটি লাগেজও র্যাব সদস্যদের নিয়ে যেতে দেখা যায়।
এরপর র্যাবের নির্বাহী হাকিম পলাশ কুমার বসু ওই বাড়ির নিচতলায় সাংবাদিকদের বলেন, সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে হেলেনা জাহাঙ্গীরের ফ্ল্যাটে অভিযান চাানো হয়।

 

অভিযানে ওই বাসা থেকে বিদেশি মদ, ওয়াকিটকি সেট, বিদেশি মুদ্রা, জুয়া খেলার সরঞ্জাম ও হরিণের চামড়া জব্দ করার কথা বলেন তিনি।

 

পলাশ বসু বলেন, জব্দকৃত আলামত ও সুনির্দিষ্ট অভিযোগের বিষয়ে আরও বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেলেনা জাহাঙ্গীরকে আমরা গ্রেফতার করেছি।

তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন আইনে মামলা হবে।

 

হেলেনা জাহাঙ্গীরকে সুনির্দিষ্ট কোন অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে - সাংবাদিকদের প্রশ্নে তিনি বলেন, বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ব্যবস্থা গ্রহণপূর্বক আপনাদের (সাংবাদিক) অতি শিগগিরই ইনফর্ম করব।

 

হেলেনা জাহাঙ্গীরকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে - জানতে চাইলে র্যাবের হাকিম বলেন, র্যাব সদর দপ্তরে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছে এবং জিজ্ঞাসাবাদ শেষে বিস্তারিত জানানো হবে।

 

এরপর রাতেই মিরপুরে হেলেনা জাহাঙ্গীরের মালিকানাধীন জয়যাত্রা ফাউন্ডেশন এবং জয়যাত্রা টেলিভিশনের অফিসে অভিযান চালায় র্যাব। আইপি টেলিভিশনটির কোনো কাগজপত্র নেই বলে জানায় আইনশৃংখলা বাহিনী।

 

তদন্ত করে যদি বৈধ কাগজপত্র না পাওয়া যায় তাহলে চ্যানেলটি বন্ধ করে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন, র্যাব সদর দফতরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নাদির শাহ। যদিও সম্প্রচার চ্যানেল হিসেবে যেসব সেটাআপ থাকা দরকার তার সবকিছুই রয়েছে।

 

নাদির শাহ বলেন, হেলেনা তার জয়যাত্রা টেলিভিশনের জন্য সারা দেশে প্রতিনিধি নিয়োগ করেছিলেন। এমনকি দেশের বাইরেও প্রতিনিধি নিয়োগের নামে অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বৈধ কাগজপত্র না পাওয়ার কারণে পরবর্তীতে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে। এছাড়া এখানে জয়যাত্রা ফাউন্ডেশনের অফিস পেয়েছি। এ বিষয়েও তদন্ত করা হবে।

 

দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইর পরিচালক হেলেনা জাহাঙ্গীর জয়যাত্রা গ্রুপের কর্ণধার।

 

জয়যাত্রা টেলিভিশনের চেয়ারপারসন হেলেনা নিজেকে আইপি টিভি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি হিসেবেও পরিচয় দেন।

 

হেলেনা জাহাঙ্গীর আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক উপকমিটিতে সদস্য পদে ছিলেন। কুমিল্লা উত্তর জেলা আওয়ামী লীগেরও উপদেষ্টা পরিষদে ছিলেন তিনি।

 

‘বাংলাদেশ আওয়ামী চাকরিজীবী লীগ’ নামের একটি সংগঠনে হেলেনা জাহাঙ্গীরের সভাপতি হওয়ার খবর চাউর হলে সম্প্রতি তাকে দুই কমিটি থেকেই বাদ দেয় আওয়ামী লীগ।

 

হেলেনা এর আগে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে মেয়র পদে প্রার্থী হতে চেয়েছিলেন। কুমিল্লায় আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা ও সাবেক মন্ত্রী আব্দুল মতিন খসরুর আসনে উপনির্বাচনেও প্রার্থী হতেও চেয়েছিলেন তিনি। তবে কোনোবারই তিনি দলের মনোনয়ন পাননি।

 

হেলেনা জাহাঙ্গীরকে আটকের সময় র্যাব নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে মাদকসহ যেসব মালামাল জব্দ করেছে সে বিষয়ে মুখ খুলেছেন হেলেনার মেয়ে জেসিয়া আলম।

 

বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে গুলশানের বাসায় অভিযান শেষে সাংবাদিকদের কাছে এ বিষয়ে বিস্তারিত বলেন জেসিয়া। মদের বিষয়ে জানতে চাইলে বলেন, আমার ভাইয়া মদ পান করেন। সেগুলোই বাসায় ছিল। তবে ভাইয়ার মদ পানের লাইসেন্স রয়েছে। পাসপোর্টও আছে। করোনার মধ্যে আমরা মদ স্পর্শ করিনি। 


হরিণের চামড়ার বিষয়ে হেলেনার মেয়ে বলেন, ভাইয়ার বিয়ের সময় মায়ের সঙ্গে রাজনীতি করা নেতানেত্রীরা মিলে ওটা গিফট করেছিলেন। সেটি দেয়ালে ঝোলানো ছিল।

 

ক্যাসিনোর সরঞ্জামাদির বিষয়ে তিনি বলেন, ক্যাসিনোর চিপস সেগুলো। আমরা নিজেরাই খেলতাম আর সময় কাটাতাম। তবে ক্যাসিনো খেলতে যে বোট আর সরঞ্জাম লাগে তা নেই আমাদের। ধরেন বাসায় তাস খেলে না কেউ? সে রকম একটা কিছু আরকি। জাস্ট ক্যাসিনোর চিপগুলো ছিল বাসায়। মানুষ গেম খেলতে পারে না? ওরকম।

 

বিদেশি মুদ্রার বিষয়ে জেসিয়া বলেন, আমরা র্যান্ডমলি বিদেশে যাই। একাধিক দেশে আমাদের নিয়মিত যাতায়াত রয়েছে। বিদেশ থেকে আসার পর যে মুদ্রাগুলো বেঁচে যায় সেগুলো তো রাস্তায় ফেলে দিতে পারি না। ওইসব মুদ্রা থেকে গেছে।

 

গভীর রাতে অভিযান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন হেলেনার মেয়ে। বলেন, আমাদের বাসায় ইলিগ্যাল মালামাল রয়েছে, মানলাম। তাই বলে ওরকমভাবে অভিযান করা যায়। কোনো ওয়ারেন্ট নেই, সার্চ ওয়ারেন্ট নেই হুট করে ঢুকে গেল, আর অভিযান চালাল। কোনো কো-অপারেট নেই।

 

গুলশানের ৩৬ নম্বর রোডের ৫ নম্বর বাসা থেকে দীর্ঘ প্রায় চার ঘণ্টা অভিযান শেষে হেলেনা জাহাঙ্গীরকে আটক করে নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে র‌্যাব।