ঢাকা, ১৪ ডিসেম্বর শনিবার, ২০১৯ || ৩০ অগ্রাহায়ণ ১৪২৬
LifeTv24 :: লাইফ টিভি 24
২৯৯

এতো তদন্তে জর্জরিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প

প্রকাশিত: ১২:৩৯ ২০ ডিসেম্বর ২০১৮  

ছবি সংগৃহীত

ছবি সংগৃহীত


একের পর এক তদন্ত নিয়ে জর্জরিত হচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচন শেষ হয়েছে প্রায় দুই বছর হয়ে গেল। কিন্তু জয়ের পর থেকে সেই নির্বাচনের এক ইস্যুর জের টানতে টানতেই জর্জরিত  ডোনাল্ড ট্রাম্প।

২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারে রাশিয়ার সঙ্গে গোপন আঁতাতের অভিযোগে ফেডারেল তদন্তসহ বিভিন্ন জনের কথা শুনতে শুনতে নিত্যদিনই হ্যাপা সামলাতে হয় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে। তদন্তের এক হোতাকে বরখাস্ত করেও নিষ্কৃতি মেলেনি তার। উল্টো পুরো বিষয়টি যেন তাঁর ঘারের ওপর জেঁকে বসেছে।

কিন্তু এটাই ট্রাম্পের বিরুদ্ধে চলা একমাত্র তদন্ত নয়; তাঁর সহচরদের একের পর এক অভিযোগের শিকার হচ্ছেন তিনি। সেই তদন্তের আঁচ পুরোপুরিই ভোগ করতে হচ্ছে ট্রাম্পকে। কারণ, সহচরেরা তাঁকে রক্ষায় কী কী করেছিলেন, কী কী মিথ্যা বলেছিলেন, সেসব বয়ান এখন দিতে শুরু করেছেন আদালতে।

বিভিন্ন ইন্টারন্যাশনাল জার্নালে উঠে এসেছে সেসব তদন্তের বিষয়।

এএফপি বলছে, নির্বাচনে রুশ হস্তক্ষেপের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (এফবিআই) সাবেক পরিচালক রবার্ট ম্যুলারের তদন্ত ট্রাম্পের বিরুদ্ধে তদন্তাধীন আরও অনেক বিষয়ের মধ্যে একটি । এছাড়া ট্রাম্পের ব্যবসা ও তাঁর সহযোগীদের নিয়েও চলছে তদন্ত। 

ট্রাম্পের সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাইকেল ফ্লিন গত মঙ্গলবার আদালতে উপস্থিত হয়ে মিথ্যা বলার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। 

নিউইয়র্কের অ্যাটর্নি জেনারেল ট্রাম্পের দাতব্য প্রতিষ্ঠান ট্রাম্প ফাউন্ডেশনের বিরুদ্ধে অনৈতিক কার্যকলাপের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ করে মামলা করেছে। মামলার পর ট্রাম্প তাঁর প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ করে দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। এতেই যে ট্রাম্প মুক্তি পাচ্ছেন, তা নয়। সমস্যা আরো আছে। 

এই মুহূর্তে ট্রাম্পের ব্যাপারে কত ঘটনার তদন্ত চলছে, তা আসলে নির্দিষ্ট করে বলা মুশকিল। কারণ, অনেক ঘটনাই একটির সঙ্গে অপরটি জড়িয়ে পেচিয়ে গেছে।

মধ্যবর্তী নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠের জেরে জানুয়ারি মাসে প্রতিনিধি পরিষদে নিয়ন্ত্রণ নেবেন ডেমোক্র্যাটরা। তখন  ট্রাম্পবিষয়ক তদন্ত খতিয়ে দেখার সব ক্ষমতা থাকবে ডেমোক্র্যাটদের হাতে। আর এই সুযোগ ডেমোক্র্যাটদের হাতছাড়া করার কথা নয়। ফলে  খুব স্বস্তিতে থাকার সুযোগ নেই ট্রাম্পের। বিপদ আরো ঘনিয়ে আসছে তার ঘাড়ে।

এদিকে হোয়াইট হাউসে থাকা অবস্থায় ট্রাম্পকে ব্যক্তিগতভাবে অভিযোগের মুখোমুখি করা হবে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়ে গেছে। বহাল থাকা প্রেসিডেন্টের অভিশংসন নিয়ে আইন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে বিভক্তিও  ছোখে পড়ার মত। ‘ট্রাম্প ফাউন্ডেশন’ নিয়ে মামলায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ছাড়াও তাঁর দুই ছেলে ডোনাল্ড জুনিয়র ও এরিক এবং মেয়ে ইভাঙ্কার নাম রয়েছে। 

রুশ হস্তক্ষেপের তদন্ত
ট্রাম্পের ব্যাপারে বিভিন্ন তদন্তের মধ্যে সবচেয়ে আলোকপাত করা হয়েছে তাঁর নির্বাচনী প্রচারে রাশিয়ার হস্তক্ষেপকে। 

তদন্তে ২০১৬ সালের ৯ জুন নিউইয়র্কে ট্রাম্প টাওয়ারে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। ওই বৈঠকে রুশ আইনজীবীকে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হিলারি ক্লিনটনের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের প্রস্তাব দেওয়া হয়। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন ট্রাম্পের নির্বাচনী চেয়ারম্যান পল মানাফোর্ট, ট্রাম্পের ছেলে ডোনাল্ড জুনিয়র ও জামাতা জ্যারেড কুশনার।

ম্যুলার আরও একটি বিষয় তদন্ত করে বলছেন—উইকিলিকসের প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ ট্রাম্পের নির্বাচনী উপদেষ্টা রজার স্টোনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে ডেমোক্রেটিক পার্টির ই-মেইল কেলেঙ্কারি ঘটিয়েছিলেন। 

২০১৬ সালের নির্বাচনে হস্তক্ষেপের জন্য ২৫ জন রুশ ও তিনটি রুশ কোম্পানিকে অভিযুক্ত করে ম্যুলার।

ফ্লিন এবং ট্রাম্পের আরেক নির্বাচনী উপদেষ্টা জর্জ পাপাডোপাউলোস এফবিআইকে রাশিয়ার সঙ্গে যোগযোগ থাকার ব্যাপারে মিথ্যা বলার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে ১৪ দিনের কারাদণ্ড পেয়েছে। তবে ফ্লিনের দণ্ডাদেশ ঘোষণার সময় মার্চ পর্যন্ত পিছিয়েছে।

ট্রাম্পের ব্যক্তিগত আইনজীবী মাইকেল কোহেনকে কর ফাঁকি, ব্যাংকের ভুয়া আর্থিক বিবরণী উপস্থাপন, নির্বাচনী প্রচারে অর্থ ব্যয়ের বিধিভঙ্গ ও কংগ্রেসে মিথ্যা বলার দায়ে তিন বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। 

নির্বাচনী প্রচারে অর্থ ব্যয়ে বিধিভঙ্গ
প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রচারের সময় সম্পর্কের কথা জনসমক্ষে প্রকাশ করে দেওয়ার হুমকির মুখে দুজন নারীর মুখ বন্ধ করতে বড় অঙ্কের অর্থ দেন, এটি তদন্তে উঠে এসেছে।

ট্রাম্পের আইনজীবী কোহেন স্বীকার করেছেন, মুখ বন্ধ রাখার জন্য পর্ণ তারকা স্টর্মি ড্যানিয়েলসকে ১ লাখ ১৩ হাজার ডলার এবং সাবেক প্লেবয় মডেল কারেন ম্যাকডোগালকে দেড় লাখ ডলার দেওয়া হয়।

রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলিদের মতে, এটাকে নির্বাচনে অবৈধ অর্থ ব্যয় বলা যায়, যা ওই নির্বাচনে প্রভাব ফেলে থাকতে পারে। কোহেন বলেছেন, ‘ট্রাম্পের নির্দেশেই’ তাঁরা এটা করেছেন।

ন্যায়বিচারের পথে বাধা
নির্বাচনী প্রচারে রুশ হস্তক্ষেপের তদন্ত বন্ধে বেশ তৎপর ছিলেন ট্রাম্প। তিনি জেনারেল ফ্লিনের বিরুদ্ধে এ ব্যাপারে তদন্ত বন্ধের নির্দেশ দেন এফবিআইয়ের পরিচালক জেমস কোমিকে। তবে কোমি ট্রাম্পের কথা শোনেননি। মুলারের নেওয়া এই অভিযোগের ব্যাপারে তদন্ত শুরু করলে কমিকে ২০১৭ সালের মে মাসে বরখাস্ত করেন ট্রাম্প।

মঙ্গলবার ফ্লিনের দণ্ডাদেশ দেওয়ার কথা থাকলেও তাঁর আইনজীবীর অনুরোধে তা পিছিয়ে মার্চে নেওয়া হয়। ফ্লিন ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে দোষী সাব্যস্ত হন। তিনি ট্রাম্প প্রশাসনের প্রথম শীর্ষ ব্যক্তিদের একজন যিনি নির্বাচনে রুশ হস্তক্ষেপের কারণে সাজার মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন।

 

ব্যবসায়িক সুবিধা
মার্কিন সংবিধানের এক ধারা (বেতন–ভাতাসহ সুবিধাদি) অনুসারে রাষ্ট্রের কর্তাব্যক্তিরা কোনো বিদেশি পক্ষের কাছ থেকে অর্থ নিতে পারবেন না। ‘ট্রাম্প ইন্টারন্যাশনাল হোটেল’ থেকে ব্যবসায়িক সুবিধা নিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

মেরিল্যান্ড ও ওয়াশিংটনের অ্যাটর্নি জেনারেল ট্রাম্পের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগ করেছেন যে তিনি সংবিধানের ওই ধারা লঙ্ঘন করেছেন। কারণ, তাঁর হোটেল বিদেশি সরকারের সঙ্গে ব্যবসা করে।

ট্রাম্প ইতিমধ্যে আবাসন ব্যবসা থেকে নিজের নাম প্রত্যাহার করে ছেলেদের নামে দিয়েছেন এবং অঙ্গীকার করেছেন, প্রেসিডেন্ট পদে থাকা পর্যন্ত বিদেশি সরকারগুলোর কাছ থেকে পাওয়া রাজস্ব তিনি মার্কিন কোষাগারে জমা দেবেন।

ট্রাম্প ফাউন্ডেশন
নিউইয়র্ক অ্যাটর্নি জেনারেলের মামলার মুখে পড়ে ট্রাম্প তাঁর ব্যক্তিগত দাতব্য প্রতিষ্ঠান ট্রাম্প ফাউন্ডেশন বন্ধ করে দিতে সম্মত হয়েছেন। অ্যাটর্নি জেনারেল বারবারা আন্ডারউড গত জুনে ট্রাম্প ফাউন্ডেশনের বিরুদ্ধে মামলাটি করেন। ট্রাম্পের ব্যবসা ও রাজনৈতিক স্বার্থে ফাউন্ডেশনকে অনৈতিকভাবে ব্যবহারের অভিযোগ করা হয়। মামলার অভিযোগে ট্রাম্প ছাড়াও ফাউন্ডেশনের বোর্ডে থাকা তাঁর দুই ছেলে ডোনাল্ড জুনিয়র ও এরিক এবং মেয়ে ইভাঙ্কার নাম রয়েছে।

ফাউন্ডেশন বন্ধের চুক্তি হলেও মামলায় ক্ষতিপূরণ বাবদ ২৮ লাখ মার্কিন ডলার চাওয়া হয়েছে এবং ট্রাম্প ও তাঁর তিন ছেলেমেয়েকে নিউইয়র্কের অন্যান্য অলাভজনক প্রতিষ্ঠানের বোর্ডে থাকার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা চাওয়া হয়েছে।

কর ফাঁকি
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে ট্রাম্পের পরিবারের সদস্যদের কর ফাঁকি দেওয়ার খবর উঠে আসে। নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের কর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিষয়টি তারা খতিয়ে দেখছে। প্রতিবেদন অনুসারে, নব্বই দশকে ট্রাম্পের পরিবার ‘নির্জলা প্রতারণার’ মাধ্যমে বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে শত কোটি ডলার কর ফাঁকি দিয়েছে।


এই বিভাগের আরো খবর